• বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ০৩:৪৬ পূর্বাহ্ন
Headline
দেশে এসে ১১ বছর পর বিয়ের পিঁড়িতে বসা হলো না আরিফ গাজীর দেশে ২৪ ঘন্টায় হাম উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু পল্লবীতে রামিসা ধর্ষণ-হত্যায় তৃতীয় ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা মেলেনি, একদিনেই সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন সিঙ্গাপুরে -আন্তর্জাতিক জিমন্যাস্টিকস চ্যাম্পিয়নশিপে- কোয়ান্টাম কসমো স্কুলের ৭ জিমন্যাস্ট সিনেমা হল খোলা থাকবে সন্ধ্যায় শপিং মল বন্ধ হলেও ‘জয় বাংলা স্লোগান’তোফায়েল আহমেদের জানাজা শেষে, আটক একাধিক নেতাকর্মী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে জনগণের ওপর জুলুম করা হচ্ছে: জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান অনশনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়:ভোটার তালিকা বিতর্ক (বিইআরসি) বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা বুধবার তোফায়েল আহমেদ মা-বাবা ও স্ত্রীর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত

হামে আক্রান্তদের মৃত্যু বাড়াচ্ছে নিউমোনিয়া বেশি !

প্রিন্ট নিউজ : / ৫৫ Time View
Update : বুধবার, ৬ মে, ২০২৬

হাম ও হাম উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমে এলেও, হাম-পরবর্তী বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছে শিশুরা। এরা সবাই গুরুতর অসুস্থ, বিশেষ করে হামের পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুই বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এসব রোগীর সুস্থ হতেও সময় লাগছে বেশি। হামের পর শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, ফলে তারা নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়। হামের পর নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। যেসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে তাদের অধিকাংশই নিউমোনিয়া আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল মঙ্গলবারও হাম ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ছয় জন। আর গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৫৪ জনের। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২৬৩ জন। সব মিলিয়ে গত ৫১ দিনে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৭ জনে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘এখন যেসব রোগী আসছে, তারা সবাই মূলত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রেফার্ড হয়ে আসা। তারা সবাই জটিল রোগী। হাম আগে হয়েছে এবং হাম হওয়ার কারণে শিশুরা নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। যেসব শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে—তারা বেশির ভাগ অপুষ্টির শিকার। হামের পর শিশুর ইমিউনিটি আরো কমে যাচ্ছে, ফলে তারা সহজে ডায়রিয়া বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। ইমিউনিটি কম থাকার কারণে তাদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিকও কাজ করছে না। মৃত্যু হওয়া ৯০ ভাগ শিশুই নিউমোনিয়া নিয়ে মারা যাচ্ছে। আর ডায়রিয়ায় মৃত্যু আছে দুই-একটা এবং এনকেফালাইটিস আছে কিছু।’
এই শিশু বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ‘কোভিডের কারণে ঠিকভাবে টিকা পায়নি শিশুরা। এই টিকা না পাওয়ার কারণে একজন থেকে অন্য শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের এই হাসপাতালে ৫০০-এর ওপরে হামের রোগী ভর্তি হয়ে চিকিত্সা নিয়েছে—এর মধ্যে মাত্র ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।’
আরো ছয় মৃত্যু :সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে আরো ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে এবং চার জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো হাম বিষয়ক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিশেষজ্ঞ যা বলছেন :হামের টিকার অপ্রতুলতা, শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন না হওয়া, কোভিড-পরবর্তী কিছু মানুষের টিকা বিমুুখতা, কোভিড ছাড়া অন্যদিকে দৃষ্টি কম দেওয়া এবং বিগত সরকারের সময়ে টিকার ঘাটতি, টিকা কাভারেজে ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দফায় দফায় আন্দোলনসহ—নানা কারণে শিশুদের টিকা না পাওয়াকেই হামের এই প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, ‘কোনো একটা রোগকে প্রতিরোধ করতে শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষের টিকা নিশ্চিত করতে হয়। গত বছর ২০২৫ সালে ইমিউনাইজেশনের হার ছিল শতকরা ৬৯ শতাংশ; যা অনেক কম। গত দুই বছর আমাদের টার্গেট ভ্যাকসিনেশনের কাভারেজ ৯৫ শতাংশ ছিল না। এখন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ৫ এপ্রিল থেকে টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে নিচ্ছে।’
হামে শিশুমৃত্যুর বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফায়সাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘হামের সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু পাতলা পায়খানা বা নিউমোনিয়া হয় না। হাম শুরুর চার-পাঁচ দিন পর হয়তো পাতলা পায়খানা, তারপর হয়তো নিউমোনিয়া হচ্ছে। কিন্তু হাম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি শিশুটি চিকিত্সা পেত; তাহলে হামে মৃত্যু হতো না। শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে ভুগতে ভুগতে একপর্যায়ে নিউমোনিয়া হয়ে মারা যাচ্ছে। হামে মৃত্যুর এই হারটা আরো বেশ কিছুদিন আমাদের দেখতে হবে। নতুন রোগী হয়তো আমরা দেখতে পাব না, তবে শিশুমৃত্যু দেখতে হবে।’
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম ভালো হয়ে যাওয়ার পরও চার থেকে ছয় সপ্তাহ শিশুকে খুব যত্নে রাখতে হবে। কারণ শিশুটি মাত্রই একটা বড় ধরনের অসুস্থতা থেকে উঠেছে, তাকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে, মাস্ক ব্যবহার করতে হবে, শিশুকে নিয়ে অযথা বাইরে ঘোরাফেরা করা যাবে না। ভালো পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। তা না হলে শিশু দ্রুত অন্য রোগে আক্রান্ত হবে।
সরেজমিন শিশু হাসপাতাল :এই হাসপাতালে বর্তমানে চিকিত্সাধীন আছে ৮৯ শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে দুই শিশুর। এ যাবত্ মৃত্যু হয়েছে ২২ শিশুর। গত সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের নিচতলার হাম ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় প্রতিটি বেড পূর্ণ। তবে ওয়ার্ডে রোগীর চাপ আগের চেয়ে কিছুটা কম দেখা গেছে। হাসপাতালে শিশু রোগীর সঙ্গে আছে তাদের মা-বাবা-কিংবা অন্য স্বজনেরা। তাদের অনেকের চোখ-মুখে কিছুটা স্বস্তির ছাপ স্পষ্ট; আবার আইসিইউতে থাকা বা নিউমোনিয়ার জটিলতা নিয়ে ভর্তি থাকা রোগীর অভিভাবকদের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ আর উত্কণ্টা। হাম ডেডিকেটেড ওয়ার্ডের প্রবেশমুখেই ১ নম্বর বেডে আছে ২ বছরের আবদুল্লাহ, সঙ্গে আছে শিশুটির দাদি। মা গেছে নিচে পানি আনতে। দাদি জানান, বাচ্চা আগের চাইতে অনেক ভালো। তবে তার রক্তে ইনফেকশন আছে। নিউমোনিয়াও হয়েছিল, আইসিইউ থেকে এখন ওয়ার্ডের বেডে দিয়েছে আজ দুদিন হলো। পাশের বেডে আছে পাঁচ মাস বয়সের শিশুকে নিয়ে মা লামিয়া। বললেন, হাম ছিল, এখন বাচ্চা ভালো আছে।
সামনে এগিয়ে গেলে ডানে এইচডিইউ ইউনিট আর সোজা সামনে তাকালে ১৮ বেডের হাম রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড আইসিইউ। ভেতরে রয়েছে চিকিত্সাধীন শিশু সন্তান, আর বাইরে অপেক্ষা করছে শিশুর বাবা সোহেল রানা। তিনি বলেন, ২০ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি, কোনো ধরনের উন্নতি দেখছি না বাচ্চার, দেখছি কেবল অবনতি। সোহেল জানান, তারা এসেছেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে। বললেন, ৭ মাস ১৪ দিন বয়সি শিশুর প্রথম ঠান্ডালাগা নিয়ে স্থানীয় হাসপাতালে সাত দিন থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। এরপর শরীরে হামের র্যাশ দেখা দেয়। হামের র্যাশ শুকিয়ে এলে, আবার নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় শিশু। তখন ঐ স্থানীয় হাসপাতালের চিকিত্সকরা ঢাকা শিশু হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। এখন নিউমোনিয়ার পাশাপাশি রক্তে ইনফেকশন আছে। জানি না বাচ্চা সুস্থ হবে কি-না!
প্রসঙ্গত, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে হামের টিকাদানের কাভারেজ ছিল ৫৭.১ শতাংশ, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এমআর-১ (হাম-রুবেলা) ও এমআর-২ টিকার কাভারেজ ৯০ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও ২০২৫ সালে তা ৬০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। বাংলাদেশ প্রথমে ২০২০ সালের মধ্যে হাম নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও পরে সেই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ২০২৬ সাল করা হয়। কিন্তু নির্মূল দূরে থাক, দেশ এখন উলটো হামের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে লড়ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা