ঢাকা ০৬:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেহেরপুরের চাষিরা পেঁয়াজ চাষ করে লোকসানে

প্রিন্ট নিউজ :
  • আপডেট সময় : ০৭:৪৫:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে

মেহেরপুর জেলায় এখন পেঁয়াজের ভরা মৌসুম চলছে। মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ থাকলেও কৃষকদের মনে নেই স্বস্তি। ক্ষেতভর্তি পেঁয়াজ প্রস্তুত থাকলেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় তা উত্তোলন করতে পারছেন না অনেক চাষি। বাজারে দরপতন ও ক্রেতা সংকটের কারণে বড় ধরনের লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন তারা।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন। তবে উৎপাদন ভালো হলেও বাজারদরের ধস কৃষকদের হতাশ করে তুলেছে।

মুজিবনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিতে পেঁয়াজের চাষ হয়েছে। কিন্তু কৃষকদের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। অনেকেই পেঁয়াজ তুলে বিক্রি না করে জমিতেই রেখে দিচ্ছেন, দাম বাড়ার আশায়।

মুজিবনগর উপজেলার স্থানীয় কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, ‌‘প্রতি মণ পেঁয়াজ এখন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দামে বিক্রি করলে আমাদের খরচই উঠবে না। সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক—সব কিছুর দাম বেড়েছে। আমরা তো বিপদে পড়ে গেছি।’

আরেক কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছরও এমন পরিস্থিতি হয়েছিল। এবারও যদি একই অবস্থা থাকে, তাহলে আমাদের পেঁয়াজ চাষ বন্ধ করে দিতে হবে। সরকার যদি এ সময়ে আমদানি করে, তাহলে আমরা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হবো।’

একই গ্রামের কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্ট করে ফসল ফলাই। কিন্তু বাজারে ন্যায্য দাম না পেলে সব পরিশ্রম বৃথা যায়। এখন যে দামে বিক্রি হচ্ছে, তাতে প্রতি কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা লোকসান হচ্ছে।’

কৃষক নজরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পেঁয়াজ ওঠার মৌসুমে বিদেশ থেকে আমদানি বন্ধ রাখা উচিত। তা না হলে দেশের কৃষকেরা টিকে থাকতে পারবে না। আমাদের উৎপাদিত পেঁয়াজের সঠিক দাম নিশ্চিত করতে হবে।’

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকদের খরচ পড়ছে প্রায় ১৯ টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে তারা বিক্রি করছেন ১৭ থেকে ১৮ টাকা দরে। ফলে প্রতি কেজিতেই লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে গেছে। এতে তারাও চাপে আছেন।

এ বিষয়ে কৃষি বিপণন কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, ‌‘পেঁয়াজের ভরা মৌসুমে যাতে আমদানি না হয়, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে।’

এ দিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সঞ্জিব মৃধা বলেন, ‘কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, পেঁয়াজ উত্তোলনের পর ১০ থেকে ১৫ দিন জমিতে সেচ না দিতে। এতে কিছুদিন জমিতেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং কৃষকেরা ভালো দামের জন্য অপেক্ষা করতে পারবেন।’

সব মিলিয়ে উৎপাদন ভালো হলেও বাজার ব্যবস্থাপনা ও আমদানি নীতির কারণে মেহেরপুরের পেঁয়াজ চাষিরা এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

মেহেরপুরের চাষিরা পেঁয়াজ চাষ করে লোকসানে

আপডেট সময় : ০৭:৪৫:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

মেহেরপুর জেলায় এখন পেঁয়াজের ভরা মৌসুম চলছে। মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ থাকলেও কৃষকদের মনে নেই স্বস্তি। ক্ষেতভর্তি পেঁয়াজ প্রস্তুত থাকলেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় তা উত্তোলন করতে পারছেন না অনেক চাষি। বাজারে দরপতন ও ক্রেতা সংকটের কারণে বড় ধরনের লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন তারা।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন। তবে উৎপাদন ভালো হলেও বাজারদরের ধস কৃষকদের হতাশ করে তুলেছে।

মুজিবনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিতে পেঁয়াজের চাষ হয়েছে। কিন্তু কৃষকদের চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। অনেকেই পেঁয়াজ তুলে বিক্রি না করে জমিতেই রেখে দিচ্ছেন, দাম বাড়ার আশায়।

মুজিবনগর উপজেলার স্থানীয় কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, ‌‘প্রতি মণ পেঁয়াজ এখন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দামে বিক্রি করলে আমাদের খরচই উঠবে না। সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক—সব কিছুর দাম বেড়েছে। আমরা তো বিপদে পড়ে গেছি।’

আরেক কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছরও এমন পরিস্থিতি হয়েছিল। এবারও যদি একই অবস্থা থাকে, তাহলে আমাদের পেঁয়াজ চাষ বন্ধ করে দিতে হবে। সরকার যদি এ সময়ে আমদানি করে, তাহলে আমরা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হবো।’

একই গ্রামের কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা অনেক কষ্ট করে ফসল ফলাই। কিন্তু বাজারে ন্যায্য দাম না পেলে সব পরিশ্রম বৃথা যায়। এখন যে দামে বিক্রি হচ্ছে, তাতে প্রতি কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা লোকসান হচ্ছে।’

কৃষক নজরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পেঁয়াজ ওঠার মৌসুমে বিদেশ থেকে আমদানি বন্ধ রাখা উচিত। তা না হলে দেশের কৃষকেরা টিকে থাকতে পারবে না। আমাদের উৎপাদিত পেঁয়াজের সঠিক দাম নিশ্চিত করতে হবে।’

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকদের খরচ পড়ছে প্রায় ১৯ টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে তারা বিক্রি করছেন ১৭ থেকে ১৮ টাকা দরে। ফলে প্রতি কেজিতেই লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে গেছে। এতে তারাও চাপে আছেন।

এ বিষয়ে কৃষি বিপণন কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, ‌‘পেঁয়াজের ভরা মৌসুমে যাতে আমদানি না হয়, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে।’

এ দিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সঞ্জিব মৃধা বলেন, ‘কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, পেঁয়াজ উত্তোলনের পর ১০ থেকে ১৫ দিন জমিতে সেচ না দিতে। এতে কিছুদিন জমিতেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং কৃষকেরা ভালো দামের জন্য অপেক্ষা করতে পারবেন।’

সব মিলিয়ে উৎপাদন ভালো হলেও বাজার ব্যবস্থাপনা ও আমদানি নীতির কারণে মেহেরপুরের পেঁয়াজ চাষিরা এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।