দিনাজপুর অল্প জায়গায় লাভজনক মাছ চাষে পথ দেখাচ্ছে
- আপডেট সময় : ০৭:২৭:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলায় আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে মাছ চাষের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বাড়ির আঙিনায় ছোট ছোট ট্যাংকি স্থাপন করে দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষ করে মৎস্য চাষিরা এখন এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। খরাপ্রবণ এই এলাকায় যেখানে পানির উৎস সীমিত সেখানে এই ট্যাংক পদ্ধতিতে মাছ উৎপাদন স্থানীয়দের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে। দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিগরি পরামর্শে এই কার্যক্রম এরই মধ্যে জেলায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
হাবিপ্রবির মৎস্য অনুষদ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হারুন-উর রশিদ এই সাফল্যের বিষয়ে জানান যে পার্বতীপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে বাড়ির আঙিনায় ট্যাংকি স্থাপন করে মাছ চাষে অনেকেই সফল হয়েছেন। মূলত গবেষক দলের পরামর্শ অনুযায়ী তারা গত এক বছর ধরে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে মাছ চাষ করে আসছেন।
হাবিপ্রবির মৎস্য অনুষদ বিভাগ থেকে তাদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর এই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করা হয়।বর্তমানে পার্বতীপুর উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় ১০৫টি ট্যাংকিতে এই পদ্ধতিতে মাছের উৎপাদন চলছে।
২০ থেকে ২৫ হাজার লিটার পানি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রতিটি ট্যাংকির উচ্চতা প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ ফুট।প্রযুক্তি নির্ভর এই পদ্ধতির নাম দেওয়া হয়েছে ‘খরাপ্রবণ এলাকায় ট্যাংকিতে উচ্চ-মূল্যের দেশি প্রজাতির মাছ চাষ সরেজমিনে পার্বতীপুর উপজেলার চণ্ডিপুর ইউনিয়নের পশ্চিম হাবড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় মো. জাহিদুল ইসলাম নামের এক সফল উদ্যোক্তার কর্মযজ্ঞ। তিনি তার বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গায় ট্যাংকি স্থাপন করে কই, তেলাপিয়া, শিং ও মাগুর মাছ চাষ করছেন।
জাহিদুল ইসলামের দেখাদেখি একই উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের খামাপাড়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নরুল ইসলাম এবং পলাশবাড়ী ইউনিয়নের আমজাদ আলীও এখন লাভজনক এই পদ্ধতিতে মাছ চাষ করছেন। চাষিদের মতে এই পদ্ধতিতে বছরে অন্তত দুই থেকে তিনবার মাছ উৎপাদন সম্ভব হয় যা প্রচলিত পুকুর চাষের চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক।নারীদের মধ্যেও এই পদ্ধতি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। উপজেলার নারী উদ্যোক্তা সাহিদা বেগম জানান যে তার ট্যাংকিতে ৩ থেকে ৪ মাস পর প্রতিটি মাছ প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের হয়ে যায়।
শিং মাছের ক্ষেত্রে কেজিতে ১০ থেকে ১২টি হচ্ছে যা বাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। প্রতিবেশীরা এখন দোকান বা বাজারের পরিবর্তে সাহিদা বেগমের ট্যাংকি থেকেই তাজা মাছ সংগ্রহ করেন।এই সাফল্য দেখে প্রতিবেশী উপজেলা চিরিরবন্দর থেকেও অনেক নারী উদ্যোক্তা পার্বতীপুরে আসছেন এই প্রযুক্তি দেখার জন্য। তেতুলিয়া গ্রাম থেকে আসা রেবেকা বেগম বলেন যে আগে জানতাম শুধু পুকুরেই মাছ চাষ হয় কিন্তু এখন নিজের বাড়ির আঙিনায় এই পদ্ধতি দেখে তিনি নিজেও এটি শুরু করার পরিকল্পনা করছেন।
পেশায় পশু চিকিৎসক ফারুক আহমেদও এই আধুনিক মৎস্য চাষে যুক্ত হয়েছেন। পার্বতীপুর পৌরসভার ঝিকরপাড়া এলাকায় জমি ভাড়া নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘পার্বতীপুর অ্যাগ্রো ফার্ম ফিশারিজ’। বেসরকারি সংস্থা এমবিএসকে ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের কারিগরি সহায়তায় তিনি ১০ হাজার ও ৩০ হাজার লিটার পানির ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন মোট ছয়টি ট্যাংকি বসিয়েছেন। প্রতিটি ট্যাংকিতে ৫ থেকে ৭ হাজার পিস ভিয়েতনামি কই, শিং ও মাগুর মাছের উৎপাদন হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে ট্যাংক পদ্ধতিতে মাছ চাষে পুকুরের তুলনায় খাদ্যের খরচ অনেক কম হয়। এমবিএসকে’র মৎস্য কর্মকর্তা মো. সিরাজুল হক জানান যে এই প্রযুক্তিতে মাছের বৃদ্ধির হার অনেক বেশি এবং গুণগত মানও উন্নত হয়। যেহেতু পানি পরিশোধিত করে ব্যবহার করা হয় তাই মাছের মৃত্যুহার নেই বললেই চলে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের ম্যানেজার মো. ফয়জুর রহমান জানান যে খরাপ্রবণ এলাকায় যেখানে শুকনো মৌসুমে পুকুরে পানি থাকে না সেখানে এই পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর। বিশেষায়িত ফিল্টারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি বারবার পরিষ্কার করে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করা হয় ফলে পানির অপচয় হয় না বললেই চলে।
পার্বতীপুর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. খালেদ মোশাররফ জানান যে যাদের পুকুর নেই বা যারা অল্প জায়গায় ব্যবসা করতে চান তাদের জন্য এটি সেরা সুযোগ। এই পদ্ধতিতে পানির গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং ক্ষতিকর জীবাণু থেকে মাছকে রক্ষা করা সহজ হয়। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফায়জুর রহমানও মাঠ পর্যায়ে এই সফলতার চিত্র পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোগকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন। এই নতুন প্রযুক্তি দিনাজপুরের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

























