ঢাকা ১১:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিনাজপুরে বস্তার অভাব ও বাড়তি দাম লোকসানের মুখে কৃষক

প্রিন্ট নিউজ :
  • আপডেট সময় : ০৭:৪০:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে আলুর বাম্পার ফলন হলেও তীব্র বস্তা সংকটে লোকসানের মুখে পড়েছেন সাধারণ কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। গত বছরের তুলনায় আলুর বস্তার দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আলুর বাজারে। গত দুই দিনের ব্যবধানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি আলুর দাম ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে ফলন ভালো হওয়ার আনন্দ এখন কৃষকদের কাছে বিষাদে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ৩১ মার্চ ক্যারেজ জাতের আলু প্রতি কেজি ১৫ থেকে ১৬ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১২ থেকে ১৩ টাকায় নেমে এসেছে। দাম কমার পরেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।

বস্তার অভাবে মাঠ থেকে তোলা আলু বাড়ির উঠানে স্তূপ করে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পাটের দাম বৃদ্ধি এবং কিছু কিছু হিমাগার কর্তৃপক্ষের কৃত্রিম সংকটের কারণে বস্তার দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। গত বছর যে বস্তা ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় পাওয়া যেত, এবার তা ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ফুলবাড়ী উপজেলায় ১৮ হাজার ৮০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং চাষও হয়েছে সমপরিমাণ জমিতে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন। ফলন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হলেও সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পাটের বস্তা।উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের পাঠকপাড়া গ্রামের আলু চাষি জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি পৌনে চার বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন।

ফলন আশানুরূপ হলেও বিপত্তি বেধেছে বিক্রি নিয়ে। গত ২ এপ্রিল এক ব্যবসায়ী ১৫ টাকা কেজি দরে আলু নিতে চাইলেও পরদিন তিনি বস্তা সংকটের অজুহাতে আর আসেননি। বাধ্য হয়ে বাড়িতেই আলু স্তূপ করে রেখেছেন তিনি। একই অবস্থা রাজারামপুর গ্রামের আব্দুর রহমানের। তিনি জানান, ঈদের পরপরই ১৬০ টাকা করে বস্তা কিনলেও এখন দাম ১৮০ টাকায় ঠেকেছে। বস্তার অতিরিক্ত দামের কারণে আলু কিনে হিমাগারে রাখা ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

মেলাবাড়ী ও রাজারামপুর মৎস্যপাড়া গ্রামের কৃষকরাও একই অভিযোগ করেছেন। আল আমিন নামে এক চাষি জানান, বস্তা না পাওয়ায় তার উৎপাদিত আলুর মাত্র সামান্য অংশ হিমাগারে রাখতে পেরেছেন, বাকি আলু বাড়ির আঙিনায় পড়ে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বারাইহাট এলাকার কার্তিক চন্দ্র রায় জানান, দাম কমার ফলে ব্যবসায়ীরা বায়না করা আলুর টাকাও ফেরত নিতে চাইছেন। অথচ বাজারে আলুর খুচরা দামের সাথে এই পাইকারি দরের ব্যবধান অনেক বেশি।

শহরের বস্তা বিক্রেতা সাজু সাহার মতে, পাটের দাম বেশি হওয়ায় এবং মৌসুমের শুরুতে হঠাৎ চাহিদা বাড়ায় বাজারে বস্তার সংকট তৈরি হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ফুলবাড়ী পাইকারি আলু ব্যবসায়ী জয়ন্ত সাহা জানান, আলু সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পাটের বস্তা না থাকায় বাজারে আলুর দাম হঠাৎ করে কমে এসেছে।

এদিকে ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের প্রধান হিসাব রক্ষক আবুল হাসান জানিয়েছেন, তাদের হিমাগারের ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৬৫ হাজার বস্তা হলেও ইতোমধ্যে ১ লাখ ৭১ হাজার বস্তা আলু সংগ্রহ করা হয়েছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি আলু সংগৃহীত হওয়ায় তাদের অভিযান শেষ করতে হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, বস্তা সংকটের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে কেউ জানায়নি। তবে এমন সমস্যা তৈরি হলে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে পারেন। কৃষকরা মনে করছেন, দ্রুত বস্তার দাম নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

দিনাজপুরে বস্তার অভাব ও বাড়তি দাম লোকসানের মুখে কৃষক

আপডেট সময় : ০৭:৪০:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে আলুর বাম্পার ফলন হলেও তীব্র বস্তা সংকটে লোকসানের মুখে পড়েছেন সাধারণ কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। গত বছরের তুলনায় আলুর বস্তার দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আলুর বাজারে। গত দুই দিনের ব্যবধানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি আলুর দাম ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে ফলন ভালো হওয়ার আনন্দ এখন কৃষকদের কাছে বিষাদে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ৩১ মার্চ ক্যারেজ জাতের আলু প্রতি কেজি ১৫ থেকে ১৬ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ১২ থেকে ১৩ টাকায় নেমে এসেছে। দাম কমার পরেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।

বস্তার অভাবে মাঠ থেকে তোলা আলু বাড়ির উঠানে স্তূপ করে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পাটের দাম বৃদ্ধি এবং কিছু কিছু হিমাগার কর্তৃপক্ষের কৃত্রিম সংকটের কারণে বস্তার দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। গত বছর যে বস্তা ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় পাওয়া যেত, এবার তা ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ফুলবাড়ী উপজেলায় ১৮ হাজার ৮০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং চাষও হয়েছে সমপরিমাণ জমিতে। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন। ফলন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হলেও সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পাটের বস্তা।উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের পাঠকপাড়া গ্রামের আলু চাষি জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি পৌনে চার বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন।

ফলন আশানুরূপ হলেও বিপত্তি বেধেছে বিক্রি নিয়ে। গত ২ এপ্রিল এক ব্যবসায়ী ১৫ টাকা কেজি দরে আলু নিতে চাইলেও পরদিন তিনি বস্তা সংকটের অজুহাতে আর আসেননি। বাধ্য হয়ে বাড়িতেই আলু স্তূপ করে রেখেছেন তিনি। একই অবস্থা রাজারামপুর গ্রামের আব্দুর রহমানের। তিনি জানান, ঈদের পরপরই ১৬০ টাকা করে বস্তা কিনলেও এখন দাম ১৮০ টাকায় ঠেকেছে। বস্তার অতিরিক্ত দামের কারণে আলু কিনে হিমাগারে রাখা ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

মেলাবাড়ী ও রাজারামপুর মৎস্যপাড়া গ্রামের কৃষকরাও একই অভিযোগ করেছেন। আল আমিন নামে এক চাষি জানান, বস্তা না পাওয়ায় তার উৎপাদিত আলুর মাত্র সামান্য অংশ হিমাগারে রাখতে পেরেছেন, বাকি আলু বাড়ির আঙিনায় পড়ে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বারাইহাট এলাকার কার্তিক চন্দ্র রায় জানান, দাম কমার ফলে ব্যবসায়ীরা বায়না করা আলুর টাকাও ফেরত নিতে চাইছেন। অথচ বাজারে আলুর খুচরা দামের সাথে এই পাইকারি দরের ব্যবধান অনেক বেশি।

শহরের বস্তা বিক্রেতা সাজু সাহার মতে, পাটের দাম বেশি হওয়ায় এবং মৌসুমের শুরুতে হঠাৎ চাহিদা বাড়ায় বাজারে বস্তার সংকট তৈরি হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ফুলবাড়ী পাইকারি আলু ব্যবসায়ী জয়ন্ত সাহা জানান, আলু সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পাটের বস্তা না থাকায় বাজারে আলুর দাম হঠাৎ করে কমে এসেছে।

এদিকে ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের প্রধান হিসাব রক্ষক আবুল হাসান জানিয়েছেন, তাদের হিমাগারের ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৬৫ হাজার বস্তা হলেও ইতোমধ্যে ১ লাখ ৭১ হাজার বস্তা আলু সংগ্রহ করা হয়েছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি আলু সংগৃহীত হওয়ায় তাদের অভিযান শেষ করতে হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, বস্তা সংকটের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে কেউ জানায়নি। তবে এমন সমস্যা তৈরি হলে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে পারেন। কৃষকরা মনে করছেন, দ্রুত বস্তার দাম নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।